বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কাকে কীভাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা
বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কাকে কীভাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা
অর্থনীতিবিদরা বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কাকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছেন। তাদের মতে, এই পূর্বাভাস অপ্রত্যাশিত নয় এবং এর পেছনে বেশ কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মূল পর্যবেক্ষণ:
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কা: কোভিড-১৯ মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
* কর্মসংস্থান সংকট: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। যারা আগে দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে ছিলেন, তারা কাজ হারানোর কারণে ফের দরিদ্র হয়ে পড়ছেন।
* আয় বৈষম্য বৃদ্ধি: ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয় বৈষম্য বাড়ছে, যা দারিদ্র্য হ্রাস করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। কিছু গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
* প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়মিতভাবে দরিদ্র মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে, যা দারিদ্র্যকে আরও স্থায়ী করে তুলছে।
* সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির দুর্বলতা: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কিছু কর্মসূচি থাকলেও, সেগুলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি ছোট অংশকে সুবিধা দেয় এবং প্রায়শই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার শিকার হয়।
বাস্তব Step by Step ছোট্ট গল্প:
রহিমা বেগমের সংসার কোনোমতে চলছিল। স্বামী রিকশা চালাতেন আর তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে কিছু টাকা রোজগার করতেন। তাদের ছোট্ট একটি ছেলে স্কুলে যেত। কোভিড-১৯ এর সময় স্বামীর আয় কমে গেল, তার ওপর জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করলো। তাদের সঞ্চয় প্রায় শেষ হয়ে গেল।
একদিন রহিমা বেগমের স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়লেন, রিকশা চালানো বন্ধ হয়ে গেল। তাদের সামান্য জমানো টাকাও চিকিৎসার জন্য খরচ হয়ে গেল। রহিমা বেগম আরও বেশি কাজের সন্ধান করতে লাগলেন, কিন্তু কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ালো।
তাদের গ্রামে গত বছর ভয়াবহ বন্যা হলো। তাদের ছোট্ট ঘরটি ভেঙে গেল, কিছু হাঁস-মুরগি ভেসে গেল। বন্যার পানি নেমে গেলে তারা ধার-দেনা করে আবার ঘর তৈরি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল।
ছেলেটার স্কুলের বেতন বাকি পড়লো। রহিমা বেগম চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারতেন না। বাজারে চাল, ডাল, তেলের দাম আকাশছোঁয়া। একদিন তিনি শুনলেন, বিশ্বব্যাংক বলছে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার আরও বাড়বে। খবরটা শুনে তার বুকটা ধক করে উঠলো। তিনি ভাবলেন, "আমরা কি তবে আরও কষ্টের মধ্যে পড়বো? আমার ছেলের ভবিষ্যৎ কী হবে?"
তাদের প্রতিবেশী করিম মিয়া আগে একটি ছোট কারখানায় কাজ করতেন। কারখানাটি মন্দার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন বেকার। তিনিও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। গ্রামের আরও অনেক পরিবারের একই অবস্থা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি কর্মসংস্থান না বাড়ে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো আরও কার্যকর না হয়, তাহলে রহিমা বেগম ও করিম মিয়ার মতো আরও অনেক পরিবার দারিদ্র্যের গভীর সাগরে হাবুডুবু খাবে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা তাই অমূলক নয় এবং এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

